তথ্যসূত্র দ্য প্রিন্ট, তর্জমায় রুবাইয়া জুঁই
বাল্যবিবাহ রুখতে অসমে বিপুল ধরপাকড় শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যেই চার হাজারেরও বেশি মামলা নথিভুক্ত এবং দু’হাজারের বেশি জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে সমালোচকরা বলছেন যে সমস্যাটি নির্মুল করতে সামাজিক সচেতনতা প্রয়োজন।১৮ বছর বয়সী নিজারা বেগম জানিয়েছেন, তাঁর ২৬ বছর বয়সী স্বামী ইসমাইল আলীকে অসমের বাকসা জেলার বোথিমারি গ্রামে তাদের বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁর একটি তিন মাসের ছেলেও রয়েছে বলে জানা যায়। মাজুলিতে, ১৮ বছর বয়সী গর্ভবতী মৌসুমী হাজারিকার স্বামী ২৭ বছর বয়সী পাপ্পু হাজারিকাকে বৃহস্পতিবার রাতে গ্রেপ্তার করা হয়। জানা যায় আট মাস আগে তাদের বিয়ে হয়। ইসমাইল আলী এবং পাপ্পু হাজারিকা দুজনকেই বাল্যবিবাহের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে৷ মোনোয়ারা খাতুন নামের এক মহিলা জানিয়েছেন, “আমার বউমার বয়স যখন ১৭ ছিল, তখন বিয়ে হয়েছিল। এখন তার বয়স ১৯ এবং সে অন্তঃসত্ত্বা। আমার ছেলেকে জেলে ভরলে বউমার দেখাশোনা কে করবে?”
এদিকে অসম পুলিশের মহা নির্দেশক জি পি সিং বলেছেন, “শুক্রবার পর্যন্ত ৩৬ ঘন্টার ব্যবধানে ৪,০৭৪ টি মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে। এইসব মামলায় অভিযুক্ত আট হাজারেরও বেশি মানুষ।” শনিবার একটি টুইট বার্তায় অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বলেছেন, “আজ সকাল পর্যন্ত ২২১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই সামাজিক অপরাধের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই অব্যাহত থাকবে।” মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেছেন যে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন পর্যন্ত বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে অভিযান চলবে এবং এর জন্য একটি হেল্পলাইনও চালু করা হবে।” অন্যদিকে জি পি সিং বলেছেন, “ধৃতদের মধ্যে ৫২ জন হলেন কাজী এবং পুরোহিত, যারা বাল্যবিবাহ দিয়েছিলেন। যত জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তার মধ্যে সবথেকে বেশি সংখ্যক ধরা পড়েছে বিশ্বনাথ, বাকসা, বরপেটা, ধুবরি, হোজাই আর কোকরাঝাড় জেলাগুলি থেকে।” অপরাধের সঙ্গে জড়িত অভিভাবকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বলেন, সরকার তাদের নোটিশ পাঠাবে কিন্তু তাদের গ্রেপ্তার করা হবে না। তিনি আরও বলেন, যাদের ধরা হচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে ২০০৬ বাল্যবিবাহ রোধ আইনে মামলা হয়েছে কিন্তু যেসব ঘটনায় বিয়ে হওয়া কিশোরীর বয়স ১৪-এর কম, সেইসব ক্ষেত্রে শিশুদের ওপরে যৌন নির্যাতনরোধ আইনেও মামলা করা হচ্ছে।
তবে বাল্যবিবাহ রুখতে রাজ্য সরকারের এমন ধরপাকড়ের তীব্র সমালোচনা করার পাশাপাশি আরও মানবিক পদ্ধতির আহ্বান জানিয়েছে অন্যান্য বিরোধী দলগুলি।এছাড়াও এই কড়া পদক্ষেপের সমালোচনা করছেন সমাজকর্মীরাও। অসমের সমাজকল্যাণ বিভাগের এক আধিকারিক বলেন, “এমন কতশত মেয়ে রয়েছেন।বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে অভিযানকে স্বাগত। কিন্তু এই সব মেয়েদের প্রতি দায়িত্ববোধও তো আছে! মেয়েগুলি নিজেরাই ছোট। অত্যন্ত সংবেদনশীল ভাবে এগোতে হবে। ওদের ভবিষ্যৎ যেন নিরাপদ থাকে।” নিজারা বেগম দ্য প্রিন্টকে বলেন, “আমরা আইন সম্পর্কে কিছুই জানতাম না। আমাদের প্রেম করে বিয়ে হয়েছিল এবং সবে সন্তান হয়েছে।” স্বামীকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়ায় তিনি দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। বাড়িতে কোনো পুরুষ সদস্যও নেই। তিনি বলেন, “অভিযোগ প্রত্যাহার এবং আমার স্বামীকে দ্রুত মুক্তি দেওয়া ছাড়া আমি সরকারের কাছে কিছুই চাই না।” একই দিন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ইসমাইল আলীকেও গ্রেপ্তার করা হয়। আবার এই ধরপাকড়ের ঘটনায় ইতিমধ্যে এক যুবতী তার বাবা-মাকে গ্রেপ্তার হওয়া থেকে বাঁচাতে আত্মঘাতী হয়েছেন।
অসম কংগ্রেসের সহ-সভাপতি এবং সিনিয়র মুখপাত্র ববিতা শর্মা দ্য প্রিন্টকে বলেছেন যে গ্রেপ্তারের মতো কঠোর পদক্ষেপ নয়,সামাজিক সচেতনতাই হল সমস্যার মূল চাবিকাঠি।
তিনি বলেন, “বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে আইন আছে। সম্প্রতি, অসম মন্ত্রিসভা ১৪ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিয়েকারীদের বিরুদ্ধে মামলা নথিভুক্ত করার সিদ্ধান্ত পাস করেছে। মুখ্যমন্ত্রী এই ধরনের মেয়েদেরকে বিয়ে করা স্বামীদের গ্রেপ্তারের কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছেন সম্ভবত একটি বার্তা দেওয়ার জন্য। তবে এমন কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার সময়, তার নিজেকে জিজ্ঞাসা করা উচিত যে প্রচলিত আইন থাকা সত্ত্বেও কীভাবে এই ধরনের বিয়ে হয়েছিল এতদিন।” তিনি আরও বলেন যে, রাজ্যের সমাজকল্যাণ দফতর এবং শিশু ও মহিলা অধিকার কমিশনগুলিকে জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা উচিত। পুরোহিত, কাজী এবং অন্যান্য যারা এই ধরনের বিবাহ পরিচালনা করে তাদেরও এই অভিযানের আওতায় আনা উচিত।
জানা যায়, অল অসম মুসলিম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন বা আমসু দীর্ঘদিন ধরেই মুসলমানদের মধ্যে বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে সচেতনতা প্রচার চালায়। সংগঠনটির সভাপতি রেজাউল করিম সরকার বলেন, “বাল্য বিবাহ রোধে সরকার যে কঠোর উদ্যোগ নিয়েছে, তাকে আমরা স্বাগতই জানাচ্ছি। তবে এর সঙ্গে একটা কথা বলতে চাই, আমরা যখন সংখ্যালঘু এলাকাগুলোতে বাল্যবিবাহের সমস্যা নিয়ে ৫ বছর আগে থেকে সরব হয়েছিলাম তখন কিন্তু সরকার বা পুলিশ বা স্বাস্থ্য দপ্তর কারও সাহায্য পাই নি। সরকারের কাছে আমরা অনেকবার আবেদন জানিয়েছি, তখন আমাদের কথা কেউ শোনে নি। গত পাঁচ বছরে আমরা অন্তত সাড়ে তিন হাজার বাল্যবিবাহ আটকিয়েছি, তখন আমরাই কিন্তু গ্রামের মানুষের কাছে গালি শুনেছি, মারধর খেয়েছি বিয়ে আটকাচ্ছি বলে।”
এদিকে ইউনিসেফের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রতিবছর প্রায় দেড় লক্ষ বাল্যবিবাহ হয়ে থাকে ভারতে।জাতীয় পারিবারিক স্বাস্থ্য সমীক্ষাতে, ২০২২ সালের যে তথ্য উঠে এসেছে, তাতে দেখা গেছে যে সদ্যজাত মৃত্যুহারের দিক থেকে অসম তৃতীয় স্থানে রয়েছে। এক হাজার শিশু জন্মালে ওই রাজ্যে ৩২টি সদ্যজাত মারা যায়।ইউনিসেফ অসমের প্রধান মধুলিকা জোনাথন দ্য প্রিন্টকে বলেন যে তার দল বিভিন্ন স্তরে শিশু সুরক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে যাতে বাল্যবিবাহের মতো সমস্যাটিকে আটকানো যায়। তিনি আরও বলেন, বাল্যবিবাহ নির্মূল করার জন্য সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রয়োজন , যা আইনী বিধানের বাইরে।
