নিজস্ব প্রতিবেদক: কথায় বলে, ইচ্ছে থাকলে কোনও কিছুই অসাধ্য নয়। কেন্দ্রের আর্থিক বঞ্চনার কারণে রাজ্য কোষাগারের অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। তবুও বুধবার রাজ্য বিধানসভায় আগামী অর্থ বষের জন্য (২০২৩-২০২৪) যে বাজেট পেশ করেছেন অর্থমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য তা অনেকের প্রত্যাশার বাইরে ছিল। একদিকে যেমন রাজ্যের সরকারি কর্মচারি-পেনশন ভোগীদের জন্য ৩ শতাংশ হারে মহার্ঘ ভাতা দেওয়ার ঘোষণা করা হয়েছে, তেমনই গ্রামীণ পরিকাঠামো উন্নয়নে ‘রাস্তাশ্রী’র মতো প্রকল্প চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের আওতায় থাকা মহিলাদের ৬০ বছর পেরনোর সঙ্গে সঙ্গে বার্ধক্যভাতার আওতায় নিয়ে আসার ঘোষণা করা হয়েছে। শিক্ষা থেকে কর্মসংস্থান, কৃষি থেকে শিল্প, স্বাস্থ্য থেকে পরিবহণ-সব ক্ষেত্রেই বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে। সংখ্যালঘু বিষয়ক ও মাদ্রাসা শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রায় ৫ হাজার ১৬৭ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। অর্থনীতির কারবারিদের মতে, রাজ্য বাজেট প্রকৃত অর্থেই জনমুখী, জনমোহিনী।
প্রত্যাশা ছাপানো বাজেট পেশের পরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেছেন, ‘আগামী অর্থ বর্ষের জন্য পেশ হওয়া বাজেট কৃষক, যুব প্রজন্মের জন্য সুখবর বয়ে নিয়েএসেছে। কর্মসংস্থানের বাজেট হয়েছে। আগামী দিনে কোটি-কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের পথ খুলে দিয়েছে।’ নাম না করে কেন্দ্রের মোদি সরকারকে নিশানা করে তিনি বলেন, ‘আমরা যেটা বলি, তা করি। ওরা যা বলে, তা করে না। বৃক্ষ তোমার নাম কী? ফলেন পরিচয়।’ স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতেই কোরাস সুরে রাজ্য বাজেটের বিরোধিতা করেছে বিজেপি, সিপিএম, কংগ্রেস নেতারা। তাঁদের অভিযোগ, আসন্ন পঞ্চায়েত ভোটের কথা মাথায় রেখেই এই বাজেট পেশ করা হয়েছে।’
এদিন দুপুর দুটোর সময়ে আগামী অর্থ বর্ষের জন্য বিধানসভায় রাজ্য বাজেট পেশ করেন অর্থ মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। তিনি জানান, ‘দেশের আর্থিক বৃদ্ধির হার যেখানে ৬ দশমিক ৯ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, সেখানে রাজ্যে আর্থিক বৃদ্ধির হার জাতীয় পর্যায়ের তুলনায় অনেকটা বেড়ে ৮ দশমিক ৪১ শতাংশ হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।’ চলতি অর্থবর্ষে রাজ্যে পণ্য পরিষেবা কর বাবদ রাজস্ব আদায় ২৪.৪৬ শতাংশ বেড়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
মহিলাদের আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুলতে গত কয়েক বছর ধরেই চেষ্টা চালাচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর স্বপ্নের প্রকল্প লক্ষ্মীর ভাণ্ডার অসংখ্য মহিলাকে আর্থিক নিরাপত্তা দিয়েছে। এদিন বাজেট পেশ করতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী জানান, রাজ্যে বর্তমানে এক কোটি ৮৮ লক্ষ মহিলা লক্ষ্মীর ভাণ্ডার পাচ্ছেন। লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের প্রাপকরা ৬০ বছর পেরোলেই সরাসরি বার্ধক্যভাতার আওতায় আসবেন। তাঁদের নতুন করে আবেদন জানাতে হবে না।
মৎস্যজীবিদের জন্য আগেই ক্রেডিট কার্ড দেওয়ার ঘোষণা করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। এদিন বাজেটে ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সি মৎস্যজীবীদের জন্য ‘মৎস্যজীবী বন্ধু’ নামে নতুন প্রকল্পের কথা জানানো হয়। ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সি মৎস্যজীবীদের স্বাভাবিক বা অকালমৃত্যুতে তাঁদের পরিবারের সদস্যদের এককালীন ২ লক্ষ টাকা অর্থ সাহায্য করা হবে। ওই খাতে ৩০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
রাস্তাশ্রী প্রকল্প নামে নতুন এক প্রকল্পের কথা ঘোষণা করা হয়েছে। বরাদ্দ করা হয়েছে তিন হাজার কোটি। ১১ হাজার কিলোমিটার নতুন রাস্তা তৈরির পাশাপাশি পুরনো রাস্তাও সারাই করা হবে। পাশাপাশি বেকার যুবক-যুবতীদের আর্থিক সহায়তার লক্ষ্যে ভবিষ্যত ক্রেডিট কার্ড নামে নতুন এক কর্মসূচিও নিয়ে আসার কথা জানানো হয়। যাতে ১৮-৪৫ বছর বয়সি যুবক-যুবতীরা সর্বাধিক ৫ লক্ষ টাকা ঋণ পাবেন। এ ক্ষেত্রে ৩৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। রাজ্য বাজেটে জোর দেওয়া হয়েছে কর্মসংস্থানের উপরেও। অর্থমন্ত্রী জানান, বীরভূমের দেউচা-পাঁচামিতে ৩৫ হাজার কোটি টাকা লগ্নি করা হবে। লক্ষাধিক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। বানতলায় চর্মশিল্পে তিন লক্ষ কর্মসংস্থাষন হয়েছে। আরও ২.২৬ লক্ষ কর্মসংস্থান হবে।
করোনার প্রকোপের সংযে জমি-বাড়ি বেচাকেনার ক্ষেত্রে স্ট্যাম্প ডিউটিতে ছাড় ঘোষণা করেছিলেন রাজ্যের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। পরে দফায়-দফায় ওই ছাড় বাড়ানো হয়। আগামী ৩১ মার্চ ওই ছাড়ের সুযোগ শেষ হওয়ার কথা ছিল। অর্থমন্ত্রী জানান এদিন জানান, স্ট্যাম্প ডিউটির ২ শতাংশ এবং জমি-বাড়ির বাজারমূল্যের সার্কল রেটের ১০ শতাংশ ছাড়ের মেয়াদ আরও ছয় মাস বাড়ানো হচ্ছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত বহাল থাকবে। গ্রাংঈণ ক্ষেত্রের অর্থনীতিতে চাঙা করতে কৃষিক্ষেত্রের উপরেও বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে। ২০১০-১১ সালে পূর্বতন বাম সরকার কৃষি ক্ষেত্রের জন্য বরাদ্দ করেছিল ২৮০.৭০ কোটি টাকা। এদিনের রাজ্য বাজেটে আগামী অর্থ বর্ষের জন্য কৃষি ক্ষেত্রে বরাদ্দ করা হয়েছে ৯৫৯৫.৩২ কোটি টাকা। টাকা। অর্থাৎ বাম জমানার তুলনায় ৩৪.২ গুণ বেড়েছে কৃষি বাজেট। কৃষিকাজে ব্যবহৃত জলের ওপর কর ছাড় দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ ক্ষেত্রে বরাদ্দ করা হয়েছে ১৮২৬৪.৬২ কোটি টাকা। বাম জমানার শেষ লগ্নে ২০১০-১১ সালে বাজেটে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ খাতে বরাদ্দ করা হয়েছিল ৯১১.৬১ কোটি টাকা।
এলাকার উন্নয়নের জন্য বিধায়কদের যে উন্নয়ন তহবিল রয়েছে তার বরাদ্দও এক ধাক্কায় বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে বছরে বিধায়ক উন্নয়ন তহবিলে ৬০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করা হয়। তা বাড়িয়ে ৭০ লক্ষ টাকা করা হয়েছে।
