মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেবকে কেন ঔরঙ্গাবাদে সমাহিত করা হয়েছিল?

ঔরঙ্গজেবের সমাধি মহারাষ্ট্রের ঔরঙ্গাবাদ শহর থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে খুলদাবাদে অবস্থিত। কিন্তু অনেকেই ভাবেন যে দিল্লির মুঘল সালতানাতের সম্রাট আওরঙ্গজেবকে কেন খুলদাবাদে সমাহিত করা হয়েছিল। এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা যাক, খুলদাবাদের প্রবেশদ্বারকে নগরখানা বলা হয়। শহরে প্রবেশ করলেই ডানদিকে ঔরঙ্গজেবের সমাধি দেখা যায়। এই সমাধিটি বর্তমানে এএসআই-এর সুরক্ষায় রয়েছে এবং এটি একটি জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভ।
ঔরঙ্গজেবের সমাধিতে যাওয়ার আগে চপ্পল-জুতো খুলে ফেলতে হয়। ঔরঙ্গজেবের সমাধিটি খুব সাধারণভাবে তৈরি করা হয়েছে। এখানে শুধু মাটি আছে। সমাধিটি একটি সাধারণ সাদা চাদর দিয়ে আবৃত। কবরের উপর একটি চারা রোপণ করা হয়েছে। শেখ শুকুর নামে একজন ঔরঙ্গজেবের সমাধি দেখভাল করেন। তার আগে তার পাঁচ প্রজন্ম এটি দেখভাল করে আসছে।
শেখ শুকুর বলেন যে, সম্রাট ঔরঙ্গজেব আদেশ দিয়েছিলেন যে, তাঁর সমাধি যেন খুব সাধারণভাবে তৈরি হয়। তাঁর ভাষ্যমতে, ঔরঙ্গজেব বলেছিলেন যে, “আমার সমাধিটি খুব সাধারণ হওয়া উচিত, এটি গাছ দিয়ে যেন আবৃত করা হয় এবং এর উপর যেন কোনও ছাদ না থাকে।” এই সমাধির কাছে একটি পাথর রয়েছে যার উপরে সম্রাট ঔরঙ্গজেবের পুরো নাম রয়েছে – আব্দুল মুজাফফর মুহিউদ্দীন ঔরঙ্গজেব আলমগীর।
ঔরঙ্গজেব ১৬১৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৭০৭ সালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। হিজরি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ঔরঙ্গজেবের জন্ম ও মৃত্যুর তারিখ এই পাথরে খোদাই করা আছে।

ঔরঙ্গজেবকে কেন ঔরঙ্গাবাদে সমাহিত করা হয়?

ঔরঙ্গজেব ১৭০৭ সালে মহারাষ্ট্রের আহমেদনগরে মারা যান এবং তাঁর দেহ খুলদাবাদে আনা হয়। ঔরঙ্গজেব তাঁর উইলে লিখেছিলেন যে, মৃত্যুর পর তাঁকে যেন তাঁর গুরু সুফি সাধক সৈয়দ জয়নুদ্দিনের কাছে সমাহিত করা হয়। ইতিহাসবিদ দুলারি কুরেশি ব্যাখ্যা করেছেন, “ঔরঙ্গজেব একটি উইল করেছিলেন যাতে স্পষ্টভাবে লেখা ছিল যে তিনি খাজা সৈয়দ জয়নুদ্দিনকে তাঁর পীর বলে মনে করেন। জয়নুদ্দিন ঔরঙ্গজেবের অনেক আগে পৃথিবীকে বিদায় জানিয়েছিলেন। ঔরঙ্গজেব প্রচুর পড়াশুনা করতেন এবং খাজা সৈয়দ জয়নুদ্দিন সিরাজকে অনুসরণ করতেন। তাই ঔরঙ্গজেব বলেছিলেন যে আমার সমাধি সিরাজের কাছেই হোক।”
এছাড়াও ঔরঙ্গজেব তাঁর উইলে বিস্তারিত লিখেছিলেন তাঁর সমাধি কেমন হওয়া উচিত। কুরেশি বলেন, “ঔরঙ্গজেব নিজের টুপি নিজেই সেলাই করতেন। তিনি নিজে হাতে কুরআন শরীফও লিখেছিলেন।” ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র আজম শাহ খুলদাবাদে তার সমাধি নির্মাণ করেন। ঔরঙ্গজেবের ইচ্ছানুযায়ী তাঁকে সৈয়দ জয়নুদ্দিন সিরাজের কাছে একটি অতি সাধারণ সমাধিতে সমাহিত করা হয়। পূর্ববর্তী সম্রাটদের সমাধিগুলিতে, জাঁকজমক ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু ঔরঙ্গজেবের সমাধি ছিল শুধু কাঠের।
কুরেশি ব্যাখ্যা করেছেন, “১৯০৪-০৫ সালে লর্ড কার্জন যখন এখানে এসেছিলেন, তখন তিনি ভেবেছিলেন এত বড় সম্রাটের সমাধি কীভাবে এত সাধারণ হতে পারে। খুলদাবাদ একটি ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক গ্রাম। এখানে ভাদ্র মারুতি মন্দির এবং মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের সমাধি ছাড়াও আছে অনেক সুফি-দরবেশের স্থান এবং বহু অভিজাত ব্যক্তির সমাধি।

খুলদাবাদ ‘পৃথিবীর স্বর্গ’ নামেও পরিচিত ছিল

খুলদাবাদের গুরুত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে ইতিহাসবিদ সংকেত কুলকার্নি বলেন, “কাবুল, বুখারা, কান্দাহার, সমরকন্দ, ইরান, ইরাক এবং দূর-দূরান্ত থেকে সুফিরা খুলদাবাদে আসতেন।”
খুলদাবাদ দক্ষিণ ভারতে ইসলামের দুর্গ এবং সুফি-সাধকদের কেন্দ্র। সারা দেশ ও বিশ্বের সুফিরা এখানে পৌঁছেছিল এবং তাদের সমাধি খুলদাবাদে রয়েছে। খুলদাবাদ ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। ঐতিহাসিকদের মতে, ১৩০০ খ্রিস্টাব্দে দিল্লির সুফি সাধক হজরত নিজামউদ্দিন আউলিয়া দাক্ষিণাত্যে ইসলাম প্রচারের জন্য তাঁর শিষ্য মুনতাজিবুদ্দিন বখশকে ৭০০ সুফি ও ফকিরসহ দেবগিরিতে পাঠান। সেই সময়ে দিল্লির সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি রাজা রামদেবরায় যাদবকে নিজের অধীনে নিয়েছিলেন। মুনতাজিবুদ্দিন দৌলতাবাদকে নিজের কেন্দ্রে পরিণত করেন এবং ইসলাম প্রচারের জন্য তার সাথে আগত সুফি ও ফকিরদের দক্ষিণ ভারতে পাঠান। ১৩০৯ সালে তিনি এখানেই মৃত্যুবরণ করেন এবং খুলদাবাদের একটি পাহাড়ের পাদদেশে এখানে তাঁর দরগাহ নির্মিত হয়।
ঐতিহাসিক কুলকার্নি বলেছেন, “মুনতাজিবুদ্দিনের মৃত্যুর পর, নিজামুদ্দিন আউলিয়া তাঁর উত্তরসূরি বুরহানুদ্দিন গরীব নওয়াজকে আরও ৭০০ ফকির ও সুফি নিয়ে দাক্ষিণাত্যে পাঠান। তাদের সাথে ছিল নবী সা. এর পোশাক এবং তাঁর চুল ছিল।” তখন থেকে খুলদাবাদ ইসলামের কেন্দ্রে পরিণত হয়। বুরহানুদ্দিন এখানে ২৯ বছর দায়িত্ব পালন করেছেন। পরবর্তীতে সুলতান মুহাম্মদ তুঘলক দেবগিরিকে তার রাজধানী করেন। একই সময়ে, জয়নুদ্দিন সেই দরবারের কাজী এবং ইসলামিক পণ্ডিত দাউদ হোসেন শিরাজীকে তার উত্তরাধিকারী হিসেবে নিযুক্ত করেন। ১৭ শতকে মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেব শিরাজীর দরগাহ পরিদর্শন করেছিলেন এবং তাঁর কাজ দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েই দাক্ষিণাত্যে তাঁর প্রচার চালান। ঔরঙ্গজেব জয়নুদ্দিন শিরাজীর কবরে চুম্বন করেন এবং তাঁকে তাঁর পীর হিসেবে গ্রহণ করেন। কুলকার্নি বলেছেন, “ঔরঙ্গজেব বলেছিলেন যে আমি ভারতের যে কোনো জায়গায় মারা যেতে পারি কিন্তু আমাকে যেন এখানে জয়নুদ্দিন শিরাজির সাথে সমাহিত করা হয়।”

মহারাষ্ট্রের সঙ্গে ঔরঙ্গজেবের সংযোগ

শাহজাহান যখন মুঘল সম্রাট ছিলেন, তখন তিনি তার তৃতীয় পুত্র ঔরঙ্গজেবকে দৌলতাবাদে পাঠান। ঔরঙ্গজেব ১৬৩৬ থেকে ১৭৪৪ সাল পর্যন্ত সুবেদার ছিলেন এবং এটিই ছিল তার প্রথম সুবেদারি পদ। ঐতিহাসিকরা বলেন যে পরবর্তীতে ঔরঙ্গজেব দৌলতাবাদ থেকে তাঁর সদর দপ্তর ঔরঙ্গাবাদে স্থানান্তরিত করেন, কারণ তিনি ঔরঙ্গাবাদকে বেশি পছন্দ করতেন।
ইতিহাসবিদ কুরেশি বলেছেন, “ঔরঙ্গজেব দৌলতাবাদ থেকে এলুরু পর্যন্ত পুরো দাক্ষিণাত্য ভ্রমণ করেছিলেন। তিনি দৌলতাবাদ থেকে এলুরু পর্যন্ত একটি রাস্তাও তৈরি করেছিলেন।” ১৬৫২ সালে, ঔরঙ্গজেব আবার ঔরঙ্গাবাদের সুবেদার পদ লাভ করেন এবং তিনি এখানে ফিরে আসেন। ১৬৫২ থেকে ১৭৫৯ সালের মধ্যে ঔরঙ্গজেব ঔরঙ্গাবাদে অনেক নির্মাণ কাজ করেছিলেন। এতে হিমায়ত বাগ এবং ফোর্ট আর্কের মতো অনেক উদ্যান রয়েছে। ঔরঙ্গজেব প্রায় সারা ভারতে মুঘল সালতানাত ছড়িয়ে দিয়েছিলেন, কিন্তু মহারাষ্ট্র থেকে মারাঠাদের আক্রমণ বাড়তে থাকে। ১৬৮১-৮২ সালে ঔরঙ্গজেব দাক্ষিণাত্যে ফিরে আসেন এবং ১৭০৭ সালে তাঁর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেখানেই ছিলেন। ১৭০৭ সালে আহমেদনগরে ঔরঙ্গজেব মারা যান।

খুলদাবাদ পর্যটনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ

খুলদাবাদের পরিচয় শুধু ঔরঙ্গজেবের সমাধিতেই সীমাবদ্ধ নয়। এখানে ভাদ্র মারুতির একটি বিখ্যাত মন্দির রয়েছে। ঔরঙ্গজেবের নাতির স্ত্রী বনি বেগমের বাগানও রয়েছে। সেই বাগানের পাশে একটি লেক আছে। খুলদাবাদ পর্যটনের দিক থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। এর ঐতিহাসিক গুরুত্বও রয়েছে।
সংকেত কুলকার্নি বলেছেন, “সাতবাহন রাজবংশের সময়কালের ধ্বংসাবশেষ এখানে পাওয়া গেছে। ঔরঙ্গজেবের সমাধি ছাড়াও এখানে বিখ্যাত সুফি সাধকদের ১২-১৫ টি মাজার রয়েছে, যেখানে প্রতি বছর উরস অনুষ্ঠিত হয়।” খুলদাবাদের ভাদ্র মারুতি মন্দির একটি বিখ্যাত তীর্থস্থান, যেখানে ভক্তরা হনুমান জয়ন্তীতে আসেন। ঔরঙ্গাবাদেই ঔরঙ্গজেব তাঁর স্ত্রীর জন্য সমাধি তৈরি করেছিলেন, যা দাক্ষিণাত্যের তাজ নামেও পরিচিত। মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেব তার ৮৭ বছরের জীবনে ৩৬-৩৭ বছর ঔরঙ্গাবাদে কাটিয়েছিলেন এবং এখানেই সমাহিত করা হয়েছিল।