‘Vini, vidi, vici’ এলেন দেখলেন জয় করলেন।
আজ শব্দগুলো বোধহয় অতিশয়োক্তি নয়। বৃহস্পতিবার রাজ ভবনের ভেতরে এক অন্য আবহ। বাংলা শিখতে চান রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস। তাই আনুষ্ঠানিকভাবে হিন্দুদের শিক্ষার দেবী সরস্বতী পদ কমলে বসেই সেই বাংলা শিক্ষার পাঠ আজ শুরু হল তাঁর। আনুষ্ঠানিকভাবে রাজভবনেই হল হাতে খড়ির অনুষ্ঠান। গত কয়েকদিন ধরেই রাজ্যপালের এই হাতেখড়ি নিয়ে কম বিতর্ক হয়নি। রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল বিজেপি রাজ্যপালের এই উদ্যোগকে খোলা মনে স্বাগত জানাতে পারেনি। দলের অন্দরেই এই নিয়ে উঠেছে নানান প্রশ্ন। বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজভবনে আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে তাই পরিচিত বিজেপি নেতা একমাত্র ত্রিপুরার প্রাক্তন রাজ্যপাল তথাগত রায়। অন্যদিকে রাজ্যের বিরোধী দলনেতা আমন্ত্রিত হলেও আসেননি। বরং এই অনুষ্ঠান নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়ে তিনি করা টুইট করেছেন। অথচ এদিন ছোট ছোট শিশুদের হাত থেকে হাতে খড়ি নেওয়ার পর রাজ্যপাল স্পষ্ট বাংলায় জানিয়ে দিলেন। ‘আমি বাংলা শিখব। বাংলা সুন্দর ভাষা। আমি বাংলাকে ভালবাসি, আমি বাংলার মানুষকে ভালোবাসি। নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু মহান নায়ক, আমার নায়ক। জয় বাংলা, জয় হিন্দ।
এই হাতে খড়ি নিয়ে কম বিতর্ক হয়নি। অথচ এদিন বিকেল চারটে থেকেই রাজভবনে এই হাতে খড়ির অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে ধীরে ধীরে অতিথিরা আসতে শুরু করে। রাজভবনের লনে মূল অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এদিনের অনুষ্ঠানের শুরুটা হয়েছিল বিশিষ্ট সংগীত শিল্পী তথা সঙ্গীত গুরু অজয় চক্রবর্তী গলায় সরস্বতী বন্দনা দিয়ে। এরপর সংগীত পরিবেশন করেন স্বাগতালক্ষ্মী দাশগুপ্ত। আর তারপরই শুরু হয় মূল হাতে খড়ির অনুষ্ঠান। যেখানে গুরুর ভূমিকায় ছিলেন নয় বছরের এক শিশু ইয়াসিনী রায়। যে রাজ্যপালের হাত ধরে বোর্ডে হওয়া লিখিয়ে হাতে খড়ি দেয়। এরপর রঞ্জনা বিশ্বাস ও শুভজিৎ ঢল রাজভবন স্কুলের ক্লাস ফোরের দুই পড়ুয়া তাকে ভাষা শিক্ষা দেয়।মঞ্চে গিয়ে তারা রাজ্যপালকে দুটি শব্দ শেখান, ‘মা’ ও ‘ভূমি’। সবাইকেই গুরুদক্ষিণা দেন- রাজ্যপাল।
এদিনের এই হাতে খড়ি অনুষ্ঠানে রাজ্যপালের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এদিন রাজ্যপালের মাতৃভাষা মালয়ালামে বক্তব্য রাখেন তিনি। একইসঙ্গে তার ইংরেজি অনুবাদও করে দেন মুখ্যমন্ত্রী। মুখ্যমন্ত্রী বলেন,বাংলা বলতে উৎসাহী রাজ্যপাল। আমাদের কাছে এটা গর্বের বিষয়। এদিন মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যপালকে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বর্ণমালা উপহার দেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, মহাত্মা গান্ধী থেকে শুরু করে অনেকেই বাংলা ভাষাকে আপন করে নিয়েছিলেন। প্রাক্তন রাজ্যপাল গোপালকৃষ্ণ গান্ধীও মাঝেমধ্যেই আমার সঙ্গে বাংলায় কথা বলতেন।
এদিন রাজ্যপালের বাংলা ভাষা শিক্ষার সূচনা হলেও মুখ্যমন্ত্রী এদিন সব ভাষা শেখার উপরি জোর দিয়েছেন। কারণ ভারতবর্ষ বৈচিত্রের দেশ। এই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষ বিভিন্ন ভাষায় কথা বলেন।তিনি বলেন,বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতিই বহুমুখী। দার্জিলিং থেকে কলকাতা, এক এক জায়গায় এক এক ভাষা। বাংলা যেন ইউনাইটেড ইন্ডিয়ার প্রতিরূপ। এদিন মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যপালকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন কারণ তিনি রাজ্যে একটা নতুন আদর্শ তৈরি করলেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষায়, আপনি দেখিয়ে দিলেন আমরা যেখানেই কাজ করতে যাই আমাদের স্থানীয় ভাষা অবশ্যই শিখে নেওয়া উচিত। এতে মানুষের সুবিধা হয়।
প্রসঙ্গত এ দিন আমন্ত্রিতের তালিকায় যেমন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী ছিলেন একইভাবে ছিলেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদারও। কিন্তু এদিনের অনুষ্ঠানে উভয়ই ছিলেন অনুপস্থিত। রাজভবন সূত্রে জানা গিয়েছে, এদিন তথাগত রায়ের উপস্থিতি রাজভবনে কোনো বিজেপি নেতা হিসেবে ছিল না। বরং তিনি আমন্ত্রিত হয়েছিলেন ত্রিপুরার প্রাক্তন রাজ্যপাল হিসাবে। মোটের উপর এদিন দিনভর চলতে থাকা রাজ্যপাল বিতর্ক মূল অনুষ্ঠানে থাকা প্রধান বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে যে আরও এক ধাপ বেড়ে গেল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এখন দেখার এই নিয়ে কি প্রতিক্রিয়া দেন তারা।
