‘যোগ্যদের চাকরি কেন বাতিল হলো?’ তদন্তকারী সিবিআইয়ের কাছে জানতে চায় চাকরিচ্যুত শিক্ষকেরা

চলতি সপ্তাহের শুরুতেই অর্থাৎ গত সোমবার কলকাতা হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চ এক নজিরবিহীন রায়দান করেছে। সেখানে গত ২০১৬ সালের এসএসসিতে চারটি বিভাগে নিয়োগে ২৫,১১৩ জনের চাকরি বাতিল হয়েছে। এতে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে সাধারণ চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে। নিয়োগে যোগ্য যারা,তারা সর্বমোট নিয়োগে অল্পসংখ্যক অবৈধ নিয়োগের জন্য চাকরি হারিয়েছেন।মঙ্গলবার এইসব চাকরিচ্যুত শিক্ষকেরা শহীদ মিনারে বিক্ষোভ দেখান।আজাহারউদ্দিন রকি নামে এক চাকরিহারা শিক্ষক এদিন সংবাদ মাধ্যমের কাছে ক্ষোভ উগরে দেন।প্রায় দু বছরের কাছাকাছি সিবিআই তদন্ত চালাচ্ছে। তাতে কেন প্রকৃত যোগ্যদের চাকরি বাতিল হবে? সেই প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই।তাদের বক্তব্য কেন অযোগ্য কয়েক জনের জন্য যোগ্যদের শাস্তি পেতে হচ্ছে? সিবিআই এতদিন ধরে তল্লাশি চালিয়ে কেন অযোগ্য চাকরিজীবিদের মধ্যে ফারাক করতে পারল না। তাদের আরও প্রশ্ন সিবিআই এতদিন ধরে কি করল। মঙ্গলবার সকাল থেকেই বিভিন্ন জেলার চাকরিপ্রার্থীরা জড়ো হয়েছেন শহিদ মিনার চত্ত্বরে। তাদের প্রত্যেকেরই বক্তব্য হঠাৎ করে চাকরি হারালে তাদের বড় রকম সমস্যায় পড়তে হয়েছে। আর্থিক সংকটের পাশাপাশি তাদের সামাজিক সংকটের মুখোমুখি হতে হয়েছে। চাকরিহারাদের একাংশের কথায় অযোগ্য চাকরিপ্রাপকদের জন্য যোগ্য চাকরিপ্রাপকদের অপরাধী হিসেবে দেখা হবে।হাইকোর্টের নির্দেশে চাকরিহারারা দ্রুত সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হবে বলে জানা গেছে । ইতিমধ্যেই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জড়ো করতেও শুরু করেছে তারা। এক চাকরিহারা জানিয়েছেন-‘ তারা ওআরএম শিট বা উত্তরপত্রগুলি জড়ো করা হচ্ছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে অনেকেরই নাম মেধাতালিকায় রয়েছে’। সেইসব কাগজ নিয়েই সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হচ্ছেন। সেখানেই ন্যায়বিচার চাইবেন তাঁরা। যারা অযোগ্য তাদের কোনও মাথাব্যাথা নেই। কিন্তু যারা যোগ্য তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবে বলেও জোরের সঙ্গে জানিয়েছেন।এই রাজ্যে নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় কলকাতা হাইকোর্টের সিঙ্গেল বেঞ্চ থেকে ডিভিশন বেঞ্চ এর পাশাপাশি নিম্ন আদালতে সিবিআইয়ের তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন দেখা গেছে। ২৪ হাজার নিয়োগের মধ্যে মাত্র ৫ নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বাকি ১৯ হাজার চাকরি কিভাবে অবৈধ হল? তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে এসএসসি কর্তৃপক্ষ। এসএসসির চেয়ারম্যান সিদ্ধার্থ মজুমদার বলেন, ‘আমরা অর্ডারটি দেখে আমাদের আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলবো। সিবিআই যে তদন্ত করছিল, তাতে মোটামুটি ৫ হাজার জনের চাকরি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। আর চাকরি করছিলেন ২৪ হাজারের বেশি শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মী। তাহলে এই ৫ হাজার বাদ দিয়ে বাকি ১৯ হাজার জনের চাকরি যাওয়ার বিষয়ে আদালত কী যুক্তি দিচ্ছেন, তা জানতে হবে।’ কলকাতা হাইকোর্টের রায় প্রসঙ্গে রাজ্যের শিক্ষক সংগঠন হিসেবে মাধ্যমিক শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতি (STEA)’র সভাপতি গৌতম মহান্তি ও সাধারণ সম্পাদক নীলকান্ত ঘোষ তাঁরা সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছেন , “সমিতি মনে করে অনৈতিক উপায়ে প্রাপ্ত চাকরি বাতিল করা একেবারে ঠিক কাজ। এই অনৈতিক নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত শিক্ষা প্রশাসনের আমলা তথা নেতা মন্ত্রীদের কঠোর শাস্তি প্রদান করার দাবি করছি। সমান্তরাল ভাবে উপযুক্ত যোগ্যতার ভিত্তিতে চাকরি প্রাপ্তদের চাকরি নিয়ে কোনো অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়া কাম্য নয়, সমিতি সর্বতোভাবে তাদের পাশে আছে এবং থাকবে। যোগ্য অথচ বঞ্চিত চাকরি প্রার্থীদের নিয়োগের দাবিতে ন্যায্য অধিকার আদায়ে আমাদের সমিতি লড়াই আন্দোলন চালিয়ে যাবে”।শিক্ষানুরাগী ঐক্য মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক কিংকর অধিকারী সংবাদ মাধ্যমে বলেন, “কোনভাবেই যোগ্য ব্যক্তিদের চাকরি বাতিল করা চলবে না। সবাই অযোগ্য – কোনোভাবেই তা হতে পারে না। সঠিক বিচার চাই। তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে সরকার এবং এসএসসিকে বাধ্য করে অযোগ্যদের আলাদা করে চিহ্নিত করতে হত তদন্তকারী সংস্থাকে। এসএসসির দুর্নীতির বিরুদ্ধে রায়ের মধ্য দিয়ে যেন কোনোভাবেই যোগ্য ব্যক্তিরা শাস্তি না পায় তা নিশ্চিত করতে হবে। দীর্ঘদিন রাস্তায় পড়ে থাকা যোগ্য বঞ্চিতরা দ্রুত নিয়োগ পাক। শুধু তাই নয়, দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত সমস্ত মাথাকে দৃষ্টান্তমূলক চরম শাস্তি দিতে হবে।” উল্লেখ্য, গ্রুপ সি, গ্রুপ ডি এবং নবম-দশম, একাদশ-দ্বাদশের ২৫ হাজার ৭৫৩ জনের চাকরি বাতিলের নির্দেশ দিয়েছে বিচারপতি দেবাংশু বসাক ও বিচারপতি শব্বর রশিদির ডিভিশন বেঞ্চ। এর পাশাপাশি, চার সপ্তাহের মধ্যে অতিরিক্ত শূন্যপদে চাকরিপ্রাপকদের ১২ শতাংশ সুদ-সহ বেতন ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। ২৩ লক্ষ পরীক্ষার্থীর ওএমআর শিট পুনর্মূল্যায়নেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হাইকোর্টের নির্দেশ, নিয়োগ দুর্নীতির তদন্ত চালিয়ে যাবে সিবিআই। যাকে প্রয়োজন, তাকেই হেফাজতে নিতে পারবে তারা। এর পাশাপাশি, টেন্ডার ডেকে নতুন করে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করতে এসএসসি কে নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। গত সোমবার ৩৫০টি মামলার রায় ঘোষণা করলো বিচারপতি দেবাংশু বসাক ও মহম্মদ সাব্বর রশিদির ডিভিশন বেঞ্চ। প্রায় সাড়ে তিন মাস ধরে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে হাইকোর্টের বিশেষ বেঞ্চে মামলার শুনানি চলেছে।গত ২০ মার্চ ওই বেঞ্চে শুনানি শেষ হয়।রায় ঘোষণা স্থগিত রেখেছিল আদালত।২০২১ সালের জুন মাসে শুনানি শুরু তৎকালীন বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের এজলাসে। গত ২২ নভেম্বর সন্দীপ প্রসাদের মামলায় গ্রুপ-ডি নিয়োগ মামলায় প্রথম সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দেন বিচারপতি। গত ৬ ডিসেম্বর বিচারপতি হরিশ ট্যান্ডন ও বিচারপতি রবীন্দ্রনাথ সমন্তের ডিভিশন বেঞ্চ সিবিআই-নির্দেশ স্থগিত করে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি রণজিৎ বাগের অনুসন্ধান কমিটি গড়ে।২০২২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সাবিনা ইয়াসমিনের মামলায় গ্রুপ-সি নিয়োগে সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দেন তৎকালীন বিচারপতি গঙ্গোপাধ্যায়। ডিভিশন বেঞ্চ সেই নির্দেশও স্থগিত করে বাগ কমিটিকে অনুসন্ধানের নির্দেশ দেয়। ৭ এপ্রিল নবম-দশম শিক্ষক নিয়োগের তদন্তও সিবিআই-কে। ওই বছরই ১৭ মে রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী পরেশ অধিকারীর মেয়ে অঙ্কিতা অধিকারীর বেআইনি নিয়োগ চিহ্নিত করে তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ। একাদশ-দ্বাদশ নিয়োগের তদন্তও সিবিআই-কে দেওয়া হয়।১৮ মে বিচারপতি সুব্রত তালুকদারের ডিভিশন বেঞ্চ বাগ কমিটির রিপোর্ট গ্রহণ করে সব নিয়োগ দুর্নীতির মামলা সিবিআই-কে তদন্তের নির্দেশ দেয়। ২২ জুলাই নিয়োগ মামলায় ইডির হাতে গ্রেফতার হন প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়। ২৮ সেপ্টেম্বর সিবিআই আদালতে প্রথম রিপোর্ট জমা দিয়ে জানাল বিভিন্ন ভাবে নিয়োগে দুর্নীতি হয়েছে। ওই ডিসেম্বর থেকে পরের বছর মার্চ মাসে কর্মী ও শিক্ষক মিলিয়ে বেআইনি নিয়োগ চিহ্নিত করে ধাপে ধাপে প্রায় পাঁচ হাজার নিয়োগ বাতিল করা হয়।গত বছর ৯ নভেম্বর কলকাতা হাইকোর্টকে বিশেষ বেঞ্চ গঠন করে এসএসসি-র সব নিয়োগ মামলা একত্রিত করে শুনানির নির্দেশ দেয় সুপ্রিম কোর্ট। ছ’মাসের মধ্যে ফয়সালার সময় বেঁধে দেয় দেশের শীর্ষ আদালত।গত সোমবার বাংলার নিয়োগ দুর্নীতি ইতিহাসে যুগান্তকারী রায় দেয় কলকাতা হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চ।প্রায় ২৬ হাজার চাকরি বাতিল হলো।