রাজীব-হত্যায় নলিনী শ্রীহরনের ভূমিকা ও তাঁর অজ্ঞাত গল্প

বিশেষ প্রতিবেদন : নলিনী শ্রীহরন। ভারতের সবচেয়ে দীর্ঘকালীন হাজতবাস করেছেন এই মহিলা। ১৯৯১ সালে রাজীব গান্ধি হত্যা মামলার ছয়জন দোষীর মধ্যে তিনি একজন। ১১ নভেম্বর, শুক্রবার সুপ্রিম কোর্ট তাঁর মুক্তির আদেশ দিয়েছে। শ্রীপেরামবুদুরে তিনিই একমাত্র জীবিত দোষী। ৩১ বছর পর তিনি জেল থেকে বেরিয়ে এসেছেন। প্রসঙ্গত, ১৯৯১ সালের ২১ মে, এলটিটিইর মানববোমার আঘাতে নিহত হন রাজীব গান্ধি।

কে এই নলিনী শ্রীহরন?

ইথিরাজ কলেজ থেকে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক নলিনী চেন্নাইয়ের এক বেসরকারি ফার্মে কাজ করতেন। তাঁর মা পদ্মাবতী ছিলেন একজন নার্স এবং বাবা পি শঙ্করা নারায়ণন একজন পুলিশ ইন্সপেক্টর। নলিনী তিন সন্তানের মধ্যে জ্যেষ্ঠ। ২০১৬ সালে নলিনীর বাবা মারা যান। তাঁর বাবা-মায়ের মধ্যে বনিবনার অভাব থাকায় শৈশব সুখের হয়নি নলিনীর। তিনি যখন কৈশোরে তখন তাঁর বাবা আলাদা থাকতে বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে যান। নলিনী ছিলেন বাকি দোষীদের চেয়ে আলাদা। তাঁর ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে রাজনীতির কোনও সম্পর্ক ছিল না। তাঁর ভাই ভাগ্যানাথনের মধ্যস্থতায় শ্রীহরন ওরফে মুরুগান তাঁদের বাড়িতে এসেছিলেন। মুরুগান ছিলেন লিবারেশন টাইগার্স অফ তামিল এলামের (এলটিটিই) সদস্য। পরে নলিনী এঁকে বিবাহ করেছিলেন।

রাজীব-হত্যা মামলায় তাঁর ভূমিকা

১৯৯১ সালের ২১ মে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধি এলটিটিইর এক মহিলা মানববোমার আঘাতে প্রাণ হারান। সেই সময় গান্ধি ছিলেন তামিলনাড়ুর শ্রীপেরামবুদুরে। নির্বাচনের আগে এক সভায় গিয়েছিলেন তিনি। র‍্যালি চলাকালীন ধানু নামে এক আত্মঘাতী বোমারু গান্ধির খুব কাছে চলে আসে এবং প্রণাম করতে যায়। সালোয়ার কামিজের মধ্যে লুকনো ছিল বোমা। রাজীব গান্ধি ছাড়াও প্রায় ১৫ জন এই বিস্ফোরণে নিহত হন এবং আহত হন অনেকেই। টাডা হেফাজতে থাকার সময়ে নলিনী বিবৃতিতে জানান, শুভা ও ধানু নামে দুই শ্রীলঙ্কান মহিলাকে তিনি আশ্রয় দিয়েছিলেন এবং তাঁরাই এই হামলা চালিয়েছেন। হত্যার দিন তাঁরা যে পোশাক পরেছিলেন, সেই পোশাক কিনতে বাজারে তাঁদের নিয়ে গিয়েছিলেন নলিনী। আগে থেকেই নলিনী তাঁদের পরিকল্পনা জানতেন এবং রাজীব গান্ধির র‍্যালিতে তাঁদের নিয়ে গিয়েছিলেন, এমন সব অভিযোগ ওঠে। শিবাসরন, শুভা, ধানু ও আলোকচিত্রী এস হরিবাবুকে নিয়ে বাসে করে শ্রীপেরামবুদুরে গিয়েছিলেন নলিনী। চার্জশিট থেকে জানা যাচ্ছে, নলিনী, শুভা ও এলটিটিইর মূলপাণ্ডা শিবাসরন পালিয়ে গিয়েছিলেন ধানুর বিস্ফোরণ ঘটানোর পর। হরিবাবুও ছিলেন এলটিটিইর প্রতি সহানুভূতিশীল। এই হত্যার তথ্য-প্রমাণ রাখতে হরিবাবুকে ভাড়া করা হয়েছিল। তাঁর ক্যামেরাতেই ধরা পড়েছিল, এই কাণ্ডে যুক্ত ছিলেন নলিনী। মুরুগান ও নলিনী বেশ কয়েক দিন লুকিয়ে ছিলেন রাজীব-হত্যার পরে। ১৯৯১ সালের ১৫ জুন চেন্নাইয়ের সাইদপেট বাসস্ট্যান্ড থেকে তাঁদের গ্রেফতার করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডে নলিনীর ভূমিকা নিয়ে এমনকি সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের মধ্যেও বিতর্ক দানা বেঁধেছিল, তবে, রাজীবের হত্যাকারীর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ট সম্পর্ক তাঁকে এই মামলার একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে চলে এসেছিল। গ্রেফতারির সময় তিনি অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। নলিনী একটি আত্মজীবনীমূলক বই লেখেন। নাম ‘রাজীব অ্যাসাসিনেশন : হিডেন ট্রুথস অ্যান্ড দ্য মিটিং বিটুইন নলিনী অ্যান্ড প্রিয়াঙ্কা’। সাংবাদিক একালাইবানকে তিনি সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন এবং তা তামিল থেকে ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছিল। সেখানে তিনি সেই ঘটনার কথা স্মরণ করে বলেন,”আমরা রাস্তার দিকে ২০০ ফুট হেঁটেছিলাম এবং আমি একটা বিশাল বিস্ফোরণের আওয়াজ শুনতে পেলাম। বাজি ফিটিয়ে নেতাদের স্বাগত জানানোটা খুবই সাধারণ ব্যাপার, কিন্তু এটা গোটা এলাকাকে বিধ্বস্ত করে দিয়েছিল। আমি পিছন ঘুরে দেখি একটা আগুনে গোলা ও ধোঁয়া ভূমি থেকে আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে। ওই এলাকায় হইহট্টগোল শুরু হয়ে গিয়েছিল। সবাই এদিক-ওদিক দৌড়চ্ছিল। আমি নিশ্চিত, অনেক মানুষই পদপৃষ্ট হয়ে আহত হয়েছিল। আমি তখনও জানতাম না ঠিক কী ঘটেছিল। কিছুক্ষণ পর শুভা দাঁড়াল। আমি সেই মুহূর্তেও জানি না, কী হয়েছে, কিন্তু আমি নিশ্চিত ছিলাম, সাংঘাতিক ভয়াবহ কিছু ঘটেছে। আতঙ্কে তখনও মানুষজন দৌড়চ্ছিল।”

তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ

১৯৯৮ সালে এক ট্রায়াল আদালত নলিনী ও শ্রীহরন সহ ২৬ জন অভিযুক্তকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। মূল চক্রীদের জীবন্ত ধরতে না পারার জন্য নলিনীর মা পদ্মাবতী ও ভাই ভাগ্যানাথনকেও টাডা আদালতে মৃত্যুর সাজা শোনানো হয়েছিল। ১৯৯৯ সালে সুপ্রিম কোর্ট তাঁদের মুক্তি দেয়। তবে, নলিনী, মুরুগান ও আরও পাঁচজনের মৃত্যুদণ্ডের সাজা বহাল রাখে আদালত। অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র ও খুনের (আইপিসির ১২০বি ধারা) দায় তাঁর উপর থাকলেও তিনি এই হত্যা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন না। নলিনী তাঁর বইতে লিখেছেন,”আমি তাঁদের বলেছিলাম, বিস্ফোরণের আগে আমি অন্তঃসত্ত্বা ছিলাম। আমার স্বামী এত খুশি ছিলেন যে, তিনি আমাকে কোলে তুলে নিতেন এবং আমাকে ঘিরে নাচতেন। আমরা শিশুর নাম নিয়ে আলোচনা করতাম। আমরা যদি এমন বড় মাপের একজন নেতাকে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকতাম, যদি এ সম্পর্কে জানতাম তাহলে আমরা কি আমাদের শিশুকে নিয়ে এতটা আনন্দিত হতে পারতাম? আমরা কি ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করতাম না? ২১ মে’র জনসভায় আমাকে একাকী পাঠিয়ে শান্তিতে আমার স্বামী বিছানায় যেতে পারতেন?” তাঁর বিরুদ্ধে প্রধান যে অভিযোগ ছিল তা হল, তাঁর স্বামী মগজধোলাই করেছেন তাঁর। এর উত্তরে নলিনী তাঁর বইতে লেখেন,”আমাদের দেখা হওয়ার প্রথম দিন থেকে আমাদের মধ্যে কোনও গোপনীয়তা ছিল না। গোপনে আমাদের মধ্যে কী কথোপকথন হয়েছিল তা স্বীকারোক্তিতে জানানো হয়েছে। ৭ মে থেকে ২১ মে’র মধ্যে আমাদের একদিনও দেখা হয়নি। শুধুমাত্র ১৮ মে, আমার গর্ভাবস্থা নিয়ে আমরা আনন্দ ভাগ করে নিয়েছিলাম। কীভাবে তিনি আমার মগজধোলাই করবেন? এর কোনও প্রমাণ নেই। আমার মনে হয়, আমরা যে নিরপরাধ তা প্রমাণ করার জন্য এটাই যথেষ্ট।”

১৯৯৯ সালে সুপ্রিম কোর্টের রায়

সুপ্রিম কোর্টে তিন বিচারপতির বেঞ্চে এই মামলার শুনানি হয়। দোষীদের কী সাজা হবে, সেই বিষয়ে তাঁরা আলাদা আলাদা রায় দেন। তিন বিচারপতির বেঞ্চের অধিকাংশই মৃত্যুদণ্ডের দিকে ঝুঁকে থাকলেও বিচারপতি কে টি থমাস এর বিরোধীতা করেছিলেন। তথ্য ও প্রমাণ উল্লেখ করে বিচারপতি থমাস পর্যবেক্ষণ দেন, নলিনী ছিলেন একজন ‘বাধ্য অংশগ্রহণকারী’ এবং তিনি ‘শ্রীপেরামবুদুরে বুঝতে পেরেছিলেন যে, রাজীব গান্ধিকে হত্যা করতে চলেছেন ধানু’। কিন্তু নলিনী পিছু হটতে পারেননি কারণ,’ষড়যন্ত্রের শুঁড়ে মধ্যে তিনি জড়িয়ে পড়েছিলেন’ এবং জানতেন ‘যারা পাশে দাঁড়ায়নি তাদের শেষ করে দিয়েছে শিবাসরন ও সান্থান।’ এমনটাই লিখেছিলেন বিচারপতি থমাস। তামিলনাড়ু হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্ট উভয়েই নলিনীকে দোষী সাব্যস্ত করে। তাদের মতে, স্বেচ্ছায় এই হত্যার ষড়যন্ত্রে অংশ নিয়েছিলেন নলিনী। ২০০০ সালে, সোনিয়া গান্ধির হস্তক্ষেপে নলিনীর মৃত্যুদণ্ড কমে দাঁড়ায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে। ২০১৪ সালে, বাকি তিন অপরাধীর মৃত্যুর সাজা হ্রাস করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয় সুপ্রিম কোর্ট। ২০১৮ সালে, তামিলনাড়ু সরকার রাজ্যপালের কাছে সুপারিশ করে যে, দোষীদের মুক্তি দেওয়া হোক।

কারাজীবন

প্রায় তিন দশক কারাগারে কাটিয়েছেন নলিনী। নিজের গ্রন্থে কারাগারে অত্যাচারের কথা লিখেছেন তিনি। হয়রানির পাশাপাশি চেন দিয়ে তাঁকে সপ্তাহের পর সপ্তাহ কারাকক্ষে বেঁধে রাখা হত। একজন অন্তঃসত্ত্বা হিসেবে তিনি বহু নির্যাতন সয়েছেন পুলিশের। সেই কথাও লিখেছেন ওই গ্রন্থে। নলিনী লেখেন,”কয়েকজন আধিকারিকের অনুরোধ সত্ত্বেও গায়নকোলজিস্টরা প্রসব করাতে অস্বীকার করেন। তাঁরা বলেন, নিজের সঙ্গে আমি আরও দুটি জীবন হত্যা করে ছাড়ব শেষ পর্যন্ত। আজও আমার প্রার্থনায় আমি তাঁদের স্মরণ করি।” নলিনী আরও লিখেছেন,”দুই বছর আমার সঙ্গেই ছিল আমার মেয়ে। আমি চিন্তা করি, তার ভাগ্য এভাবে শেষ হয়ে যেতে পারে না। এক বন্ধুর মায়ের সঙ্গে তাকে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। এক আধিকারিক হুমকি দিয়েছিলেন, তিনি আমার মেয়েকে যৌন পেশায় নামিয়ে দেবেন। মেয়ের জন্মের আগেই এই হমকি। সে কী ভুলটা করেছিল? আমি কীভাবে আমার সঙ্গে তাকে জেলে রাখতে পারতাম?” জেলেই নলিনী এমসিএ ডিগ্রি সমাপ্ত করেছেন। বিউটিসিয়ান সার্টিফিকেট কোর্স সহ দর্জি ও যোগ ইন্সট্রাক্টরের কোর্স শেষ করেছেন তিনি। গত ২৯ বছরে মাত্র দুইবার জেলের বাইরে বেরিয়েছিলেন নলিনী। ২০১৬ সালে ১২ ঘন্টার জন্য, বাবার শেষকৃত্যে যোগ দেওয়ার জন্য। ২০১৯ সালের জুলাই মাসে মেয়ে হরিথার বিবাহের আয়োজন করার জন্য তাঁকে ৫১ দিন প্যারোলে ছাড়া হয়েছিল। এই দুইবার। ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বরে নলিনী চিঠি লিখেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, মাদ্রাজ হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি প্রতাপ সাহি ও তামিলনাড়ুর স্বরাষ্ট্র সেক্রেটারিকে। ক্ষমা-মৃত্যুর জন্য আবেদন করে এই চিঠি লিখেছিলেন তিনি। মুক্তি পাওয়ার পর তিনি বলেন,”গ্রেফতারির প্রথম দিন থেকেই আমি আমার মুক্তি জন্য চেষ্টা করছিলাম। প্রচুর ধাক্কা খেয়েছি, এমনকি নিজের জীবন শেষ করে দেওয়ার চিন্তাও এসেছিল। কিন্তু প্রত্যেকবার আমি নতুন করে উদ্যোগ নিয়েছিলাম।”

প্রিয়াঙ্কা গান্ধির সঙ্গে নলিনীর সাক্ষাৎ

২০০৮ সালে, রাজীব গান্ধির কন্যা প্রিয়াঙ্কা গান্ধি ভেলোর সেন্ট্রাল জেলে নলিনীর সঙ্গে দেখা করতে যান। এই বিষয়ে বলতে গিয়ে নলিনী বলেন, সেটা ছিল অবিশ্বাস্য। তিনি জানান,”সেটা বিশ্বাস করতে তাঁকে ছুঁয়ে দেখতে হয়েছিল। তিনি পরীর মতো। আমি ভীত ছিলাম। তাঁর বাবার হত্যা নিয়ে তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করতে চেয়েছিলেন। তিনি কেঁদে ফেলেন। আমি যা জানতাম, সব তাঁকে বলেছিলাম। তাঁর ফিরে যাওয়ার পর আমি শঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম। আমি প্রার্থনা ও উপবাস করেছিলাম তাঁর নিরাপদ যাত্রার জন্য।” মুক্তির পর প্রথম প্রেস কনফারেন্সে নলিনী বলেন, ওই বিষয়ে তিনি যা জানতেন তা সবই প্রিয়াঙ্কাকে জানিয়েছেন। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়, প্রিয়াঙ্কার মনে জোর ছিল নাকি আবেগপ্রবণ হয়ে কাঁদছিলেন? নলিনী জানান,”হ্যাঁ, তিনি খুব আবেগপ্রবণ ছিলেন।”

আগামীর পরিকল্পনা

তিনি জানিয়েছেন, ত্রিচির বিশেষ বন্দিশিবির থেকে তাঁর স্বামী মুরুগানের আইনি মুক্তিই এখন তাঁর অগ্রাধিকার। নলিনীর কন্যা এখন ইংল্যান্ডে থাকেন। তাঁর কাছে যাওয়ার জন্য দরকার পাসপোর্ট। মেয়ের কাছে গিয়ে সেখানেই থেকে যেতে চান নলিনী। তিনি বলেন,”আমার গোটা পরিবার ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। সেই টুকরোগুলি আমাকে জড়ো করতে হবে। আপতকালীন নথি ও পাসপোর্টের জন্য আমরা শ্রীলঙ্কান হাই কমিশনের দ্বারস্থ হব যাতে আমাদের কন্যা ইংল্যাণ্ডে নিয়ে যেতে পারে আমাদের।”